প্রতিদান
— জসীম উদ্দীন
HSC Bangla 1st Paper | Class XI–XII | Learnfinity BD | পল্লীকবির ক্ষমা ও প্রেমের অমর কবিতা
বিভাগ ১ — কবি পরিচিতি: জসীম উদ্দীন
বিষয় | তথ্য |
পুরো নাম | জসীম উদ্দীন (মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন মোল্লা) |
জন্ম | ১ জানুয়ারি ১৯০৩ |
জন্মস্থান | তাম্বুলখানা গ্রাম, ফরিদপুর জেলা, বাংলাদেশ |
মৃত্যু | ১৩ মার্চ ১৯৭৬, ঢাকা |
উপাধি | 'পল্লীকবি' — বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ পল্লীকবি |
পেশা | কবি, লেখক, অধ্যাপক (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), লোকসাহিত্য গবেষক |
সাহিত্যধারা | পল্লীকবিতা, লোকজ ছন্দ, গ্রামবাংলার মানুষের জীবন ও অনুভূতি |
বিখ্যাত রচনা | নকশীকাঁথার মাঠ (১৯২৯), সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৩), বালুচর (১৯৩০), রাখালী (১৯২৭), মাটির কান্না (১৯৫১) |
পুরস্কার | একুশে পদক (১৯৭৬), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬০), ভারতের পদ্মশ্রী (১৯৭৬) |
বিশেষ তথ্য: জসীম উদ্দীনের 'নকশীকাঁথার মাঠ' কবিতাটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং এটি ইংরেজি, জার্মান, ফরাসিসহ বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁকে বলা হয় 'বাংলার হোমার'। |
'প্রতিদান' কবিতাটি জসীম উদ্দীনের 'মাটির কান্না' (১৯৫১) কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া। এটি ক্ষমা, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও মানবিক মহত্ত্বের এক অসাধারণ কবিতা। |
বিভাগ ২ — কবিতার পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
'প্রতিদান' শব্দের অর্থ
'প্রতিদান' শব্দের অর্থ হলো — কারো দেওয়া কিছুর বিনিময়ে কিছু ফিরিয়ে দেওয়া, প্রত্যুত্তর বা বিনিময়। সাধারণত 'প্রতিদান' মানে — যেমন পাই, তেমন ফেরত দিই। কিন্তু এই কবিতায় কবি সম্পূর্ণ উল্টো প্রতিদানের কথা বলেছেন — যে ক্ষতি করেছে, তাকেই ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়া।
কবিতার মূল দর্শন: যিনি আঘাত করেছেন, তাঁকেও ভালোবাসা — এটি খ্রিস্টধর্মের 'অপর গাল এগিয়ে দাও' বা ইসলামের 'ক্ষমা করো' বা হিন্দু দর্শনের 'অহিংসা পরম ধর্ম' — সব ধর্মের সার্বজনীন মানবিক বার্তা। |
জসীম উদ্দীনের কবিতার বৈশিষ্ট্য
জসীম উদ্দীনের কবিতা সাধারণ গ্রামীণ মানুষের ভাষায় লেখা। তিনি লোকসাহিত্যের ছন্দ ও অনুপ্রাস ব্যবহার করেন। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত ব্যথা সার্বজনীন হয়ে ওঠে। 'প্রতিদান' কবিতায়ও সাধারণ গ্রামীণ ভাষায় গভীর দার্শনিক বার্তা দেওয়া হয়েছে।
বিষয়বস্তু সংক্ষেপ: কবি বলছেন — যে আমার ঘর ভেঙেছে, আমি তার ঘর বাঁধব। যে আমাকে পর করেছে, আমি তাকে আপন করব। যে বিষ দিয়েছে, আমি গান দেব। যে কাঁটা দিয়েছে, আমি ফুল দেব। এটি নিঃস্বার্থ মানবপ্রেমের চূড়ান্ত প্রকাশ। |
বিভাগ ৩ — সম্পূর্ণ কবিতা
প্রতিদান
– জসীম উদ্দীন
আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর,
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।
যে মোরে করিল পথের বিবাগী-
পথে পথে আমি ফিরি তার লাগি,
দিঘল রজনী তার তরে জাগি ঘুম যে হরেছে মোর;
আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর।
আমার এ কূল ভাঙিয়াছে যেবা আমি তার কূল বাঁধি,
যে গেছে বুকে আঘাত করিয়া তার লাগি আমি কাঁদি।
যে মোরে দিয়েছে বিষে-ভরা বাণ,
আমি দেই তারে বুকভরা গান,
কাঁটা পেয়ে তারে ফুল করি দান সারাটি জনম-ভর,-
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।
মোর বুকে যেবা কবর বেঁধেছে আমি তার বুক ভরি
রঙিন ফুলের সোহাগ-জড়ানো ফুল মালঞ্চ ধরি।
যে মুখে কহে সে নিঠুরিয়া বাণী,
আমি লয়ে করে তারি মুখখানি,
কত ঠাঁই হতে কত কীযে আনি সাজাই নিরন্তর-
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।
বিভাগ ৪ — স্তবকভিত্তিক লাইন-বাই-লাইন বিস্তারিত ব্যাখ্যা
পুরো কবিতাটি তিনটি স্তবকে বিভক্ত। প্রতিটি স্তবকে কবি একটি নতুন কষ্টের কথা বলেন এবং তার বিনিময়ে ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। প্রতিটি স্তবক 'রিফ্রেইন' (refrain) দিয়ে শেষ হয়। |
স্তবক ১: ঘর ভাঙা ও প্রবাসী জীবন
📌 আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর, |
➤ অর্থ: যে আমার ঘর ভেঙে দিয়েছে, আমি তার ঘর বেঁধে দিই। |
🔍 বিশ্লেষণ: 'যেবা' = যে। 'বাঁধি' = তৈরি করি, গড়ে দিই। এটি কবিতার মূল বিপরীত প্রতিদানের প্রথম উদাহরণ। যে ক্ষতি করেছে, তার উপকার করা — এটি সাধারণ মানুষের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু কবি এটাই করেন। 'ঘর' শুধু বাসস্থান নয় — এটি জীবনের সুখ, আশ্রয় ও নিরাপত্তার প্রতীক। |
📝 পরীক্ষার নোট: এটি কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লাইন — মূল বার্তার সূচনা। পরীক্ষায় এই লাইনের ব্যাখ্যা প্রায়ই আসে। |
📌 আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর। |
➤ অর্থ: যে আমাকে পর (বিজাতীয়, অপরিচিত) করে দিয়েছে, আমি তাকে আপন করতে কাঁদতে কাঁদতে ঘুরে বেড়াই। |
🔍 বিশ্লেষণ: 'আপন করিতে' = নিজের মনে করতে। 'পর' = অপরিচিত, দূরের মানুষ। 'কাঁদিয়া বেড়াই' = ব্যাকুল হয়ে খুঁজি। কবি বলছেন — যে তাঁকে ঘৃণা করেছে বা দূরে ঠেলে দিয়েছে, তাকেই তিনি আপন করে নিতে চান। এই আকুলতা বা 'লালায়িত' প্রেম অসাধারণ। |
📝 পরীক্ষার নোট: এই লাইনটি কবিতার 'রিফ্রেইন' (ধুয়া) — বারবার ফিরে আসে। এর মানে ও গুরুত্ব পরীক্ষায় জিজ্ঞেস হয়। |
📌 যে মোরে করিল পথের বিবাগী- |
➤ অর্থ: যে আমাকে পথের উদ্বাস্তু বা ঘরহারা বিবাগী করে দিয়েছে। |
🔍 বিশ্লেষণ: 'বিবাগী' = বিরাগী, গৃহহীন, বিচ্ছিন্ন পথিক — যে ঘরবাড়ি ছেড়ে পথে পথে ঘোরে। গ্রামীণ বাংলার পরিচিত চিত্র — নদীভাঙন বা সামাজিক অত্যাচারে ঘরহারা মানুষ। |
📝 পরীক্ষার নোট: 'বিবাগী' শব্দের অর্থ পরীক্ষায় আসে। |
📌 পথে পথে আমি ফিরি তার লাগি, |
➤ অর্থ: তার জন্য আমি পথে পথে ঘুরে বেড়াই। |
🔍 বিশ্লেষণ: যিনি কবিকে পথে ফেলে দিয়েছেন, কবি তারই জন্য পথে পথে ঘোরেন — কিন্তু প্রতিশোধ নিতে নয়, বরং তাকে খুঁজতে, তার ভালো করতে। এই উল্টো আচরণই কবিতার সৌন্দর্য। |
📌 দিঘল রজনী তার তরে জাগি ঘুম যে হরেছে মোর; |
➤ অর্থ: যে আমার ঘুম হরণ করেছে (কষ্ট দিয়ে ঘুমহীন রাত কাটিয়েছে), তার জন্য আমি দীর্ঘ রাত জেগে থাকি। |
🔍 বিশ্লেষণ: 'দিঘল রজনী' = দীর্ঘ রাত। 'হরেছে' = হরণ করেছে, কেড়ে নিয়েছে। 'মোর' = আমার। যে কষ্ট দিয়ে ঘুম নষ্ট করেছে, কবি তার জন্যই আবার রাত জাগেন — এবারও প্রতিশোধ নয়, ভালোবাসায়। দীর্ঘ নিদ্রাহীন রাতের চিত্র গ্রামীণ কাব্যধারায় অত্যন্ত পরিচিত। |
📝 পরীক্ষার নোট: 'দিঘল রজনী' = দীর্ঘ রাত — এই শব্দদ্বয়ের অর্থ পরীক্ষায় আসে। |
স্তবক ২: কূল ভাঙা ও বিষের বিনিময়ে গান
📌 আমার এ কূল ভাঙিয়াছে যেবা আমি তার কূল বাঁধি, |
➤ অর্থ: যে আমার কূল (তীর/আশ্রয়) ভেঙে দিয়েছে, আমি তার কূল গড়ে দিই। |
🔍 বিশ্লেষণ: 'কূল' শব্দটি বহুমাত্রিক — (১) নদীর তীর/কিনারা, (২) বংশমর্যাদা, (৩) আশ্রয় ও নিরাপত্তা। নদীভাঙন বাংলাদেশের চিরন্তন দুঃখ — নদী ভেঙে কূল নষ্ট হয়ে যায়। এখানেও যে ক্ষতি করেছে, তার কূল বাঁধার কথা বলা হয়েছে। |
📝 পরীক্ষার নোট: 'কূল ভাঙা' — বাংলাদেশের নদীভাঙনের রূপক। পরীক্ষায় কূলের একাধিক অর্থ জিজ্ঞেস হয়। |
📌 যে গেছে বুকে আঘাত করিয়া তার লাগি আমি কাঁদি। |
➤ অর্থ: যে আমার বুকে আঘাত করে চলে গেছে, তার জন্যই আমি কাঁদি। |
🔍 বিশ্লেষণ: সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী লাইনগুলোর একটি। আঘাতকারীর জন্য কান্না — এটি প্রতিশোধের বদলে ক্ষমা ও ভালোবাসার সর্বোচ্চ প্রকাশ। 'তার লাগি কাঁদি' — তার জন্যই কাঁদি, তার বিরুদ্ধে নয়। |
📝 পরীক্ষার নোট: এই লাইনের বৈপরীত্য (যে আঘাত করেছে তার জন্য কান্না) পরীক্ষায় ব্যাখ্যা করতে বলা হয়। |
📌 যে মোরে দিয়েছে বিষে-ভরা বাণ, / আমি দেই তারে বুকভরা গান, |
➤ অর্থ: যে আমাকে বিষভরা কথার তীর দিয়েছে, আমি তাকে বুকভরা গান দিই। |
🔍 বিশ্লেষণ: 'বিষে-ভরা বাণ' = বিষমাখা তীর — তীক্ষ্ণ, কষ্টকর কথা বা আচরণ। 'বুকভরা গান' = হৃদয়পূর্ণ আনন্দ, সুর। বিষের বিপরীতে গান — এটি কবিতার সবচেয়ে সুন্দর বৈপরীত্য। বিষ আত্মাকে কষ্ট দেয়, গান আত্মাকে সুখ দেয়। |
📝 পরীক্ষার নোট: 'বিষে-ভরা বাণ' ও 'বুকভরা গান' — এই দুটি বিপরীত প্রতিমার ব্যাখ্যা পরীক্ষায় আসে। |
📌 কাঁটা পেয়ে তারে ফুল করি দান সারাটি জনম-ভর,- |
➤ অর্থ: কাঁটা পেয়েও তাকে ফুল উপহার দিই, সারা জীবন ধরে। |
🔍 বিশ্লেষণ: 'কাঁটা' = যন্ত্রণা, আঘাত, তিক্ততা। 'ফুল' = সৌন্দর্য, ভালোবাসা, কোমলতা। 'জনম-ভর' = সারাজীবন। কবি শুধু একবার নয়, সারাজীবন এই ভালোবাসার প্রতিদান দিয়ে যাবেন। কাঁটার বিনিময়ে ফুল — এই রূপকটি কবিতার সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রকল্প। |
📝 পরীক্ষার নোট: কাঁটা → ফুল: এই রূপকটি অবশ্যই মুখস্থ রাখতে হবে। |
স্তবক ৩: কবর ও নিঠুর বাণীর বিনিময়ে ফুলমালঞ্চ
📌 মোর বুকে যেবা কবর বেঁধেছে আমি তার বুক ভরি / রঙিন ফুলের সোহাগ-জড়ানো ফুল মালঞ্চ ধরি। |
➤ অর্থ: যে আমার বুকে (হৃদয়ে) কবর খুঁড়েছে (হৃদয়কে মৃত করে দিয়েছে), আমি তার বুক ভরে দিই রঙিন ফুলের আদর-মাখানো ফুলবাগান ধরে। |
🔍 বিশ্লেষণ: 'কবর বেঁধেছে' = হৃদয়কে মৃত করে দিয়েছে, সমস্ত আশা-আনন্দ শেষ করে দিয়েছে। 'সোহাগ-জড়ানো' = আদর ও মমতামাখা। 'মালঞ্চ' = ফুলের বাগান। হৃদয়ের কবরের জায়গায় ফুলের বাগান — এটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী বৈপরীত্য। মৃত্যুর বিপরীতে জীবন, ধ্বংসের বিপরীতে সৌন্দর্য। |
📝 পরীক্ষার নোট: 'কবর বেঁধেছে' ও 'ফুল মালঞ্চ' — এই দুটি প্রতিমার বৈপরীত্য পরীক্ষায় বিশ্লেষণ করতে বলা হয়। |
📌 যে মুখে কহে সে নিঠুরিয়া বাণী, / আমি লয়ে করে তারি মুখখানি, |
➤ অর্থ: যে মুখ দিয়ে নিষ্ঠুর কথা বলেছে, আমি সেই মুখটিকেই হাতে তুলে নিই। |
🔍 বিশ্লেষণ: 'নিঠুরিয়া বাণী' = নিষ্ঠুর কথা, কঠোর ভাষা। 'লয়ে করে' = হাতে তুলে নেওয়া, আদর করা। যে মুখ কষ্ট দিয়েছে, কবি সেই মুখটিকে মমতায় হাতে তুলে নেন — এটি মায়ের মতো ক্ষমার প্রকাশ। |
📝 পরীক্ষার নোট: এই লাইনে মাতৃস্নেহের মতো ক্ষমার চিত্র। পরীক্ষায় এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস হয়। |
📌 কত ঠাঁই হতে কত কীযে আনি সাজাই নিরন্তর- |
➤ অর্থ: কত জায়গা থেকে কত কিছু এনে তাকে অনবরত সাজাই। |
🔍 বিশ্লেষণ: 'ঠাঁই' = স্থান, জায়গা। 'নিরন্তর' = অবিরাম, থামাথামিহীন। কবি বিভিন্ন জায়গা থেকে সুন্দর জিনিস সংগ্রহ করে আনেন — শুধু তাকে সাজিয়ে দিতে, খুশি করতে। এই নিঃস্বার্থ পরিশ্রম প্রেমের গভীরতা প্রকাশ করে। |
📌 আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর। |
➤ অর্থ: যে আমাকে পর করেছে, আমি তাকে আপন করতে কাঁদতে কাঁদতে ঘুরে বেড়াই। |
🔍 বিশ্লেষণ: এটি কবিতার রিফ্রেইন (ধুয়া) — শেষ দুটি স্তবকেই এটি ফিরে আসে। রিফ্রেইনের পুনরাবৃত্তি কবির অদম্য প্রেম ও আকুলতাকে আরও জোরালো করে তোলে। |
📝 পরীক্ষার নোট: রিফ্রেইন = ধুয়া = বারবার ফিরে আসা লাইন। কবিতার কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরীক্ষায় এটি উল্লেখযোগ্য। |
বিভাগ ৫ — গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ
শব্দ | অর্থ |
যেবা | যে (আঞ্চলিক বাংলা) |
বাঁধি | তৈরি করি, গড়ে দিই |
পর | অপরিচিত, দূরের, বিজাতীয় |
আপন | নিজের, কাছের মানুষ |
বিবাগী | গৃহহীন উদ্বাস্তু পথিক, বিরাগী |
দিঘল রজনী | দীর্ঘ রাত্রি |
হরেছে | হরণ করেছে, কেড়ে নিয়েছে |
মোর | আমার (আঞ্চলিক) |
তার লাগি | তার জন্য |
কূল | নদীর তীর; আশ্রয়; বংশমর্যাদা |
বিষে-ভরা বাণ | বিষমাখা তীর — কষ্টকর কথা বা আচরণ |
বুকভরা গান | হৃদয়পূর্ণ গান — আনন্দ ও সুর |
জনম-ভর | সারাজীবন ধরে |
কবর বেঁধেছে | হৃদয়ে সমাধি খুঁড়েছে, সব আশা নষ্ট করেছে |
সোহাগ-জড়ানো | আদর ও মমতামাখানো |
মালঞ্চ | ফুলের বাগান |
নিঠুরিয়া বাণী | নিষ্ঠুর কথা, কঠোর ভাষা |
লয়ে করে | হাতে তুলে নেওয়া, আদর করা |
ঠাঁই | স্থান, জায়গা |
নিরন্তর | অবিরাম, থামাথামিহীন, সবসময় |
কাঁদিয়া বেড়াই | কাঁদতে কাঁদতে ঘুরি |
তরে | তার জন্য (আঞ্চলিক) |
রঙিন | বর্ণময়, সুন্দর |
কীযে | কী যে (আঞ্চলিক জোর দেওয়া রূপ) |
বিবাগী | গৃহহীন, বিচ্ছিন্ন পথিক |
বিভাগ ৬ — কবিতার বৈপরীত্য বিশ্লেষণ
'প্রতিদান' কবিতার মূল শক্তি হলো এর বৈপরীত্যে। কবি যা পেয়েছেন তার বিপরীত জিনিস দিয়েছেন — এই বৈপরীত্যগুলো কবিতার হৃদয়। |
কবি যা পেয়েছেন (কষ্ট) | কবি যা দিয়েছেন (ভালোবাসা) |
✖ ঘর ভাঙা | ✔ ঘর বেঁধে দেওয়া |
✖ পর করা | ✔ আপন করার আকুলতা |
✖ বিবাগী (পথহারা) করা | ✔ তার জন্যই পথে পথে ঘোরা |
✖ ঘুম নষ্ট করা | ✔ তার তরে দিঘল রাত জাগা |
✖ কূল ভাঙা | ✔ কূল বেঁধে দেওয়া |
✖ বুকে আঘাত করা | ✔ তার জন্য কান্না |
✖ বিষে-ভরা বাণ দেওয়া | ✔ বুকভরা গান দেওয়া |
✖ কাঁটা দেওয়া | ✔ ফুল দিয়ে প্রতিদান |
✖ বুকে কবর বাঁধা | ✔ বুক ভরে ফুলমালঞ্চ দেওয়া |
✖ নিঠুরিয়া বাণী বলা | ✔ সেই মুখ মমতায় হাতে তুলে নেওয়া |
বিভাগ ৭ — মূলভাব ও বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ
১. নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও মানবিক মহত্ত্ব
কবিতার কেন্দ্রীয় বিষয় হলো নিঃস্বার্থ, প্রতিদান-নিরপেক্ষ ভালোবাসা। কবি আঘাত পেয়েছেন, কিন্তু আঘাতের বদলে ভালোবাসা দিয়েছেন। এই মহানুভবতাই মানুষকে মহৎ করে তোলে।
২. ক্ষমা ও সহমর্মিতা
'কাঁটা পেয়ে ফুল দান' — এই আদর্শ শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক। যদি প্রতিটি মানুষ অন্যায়ের বিপরীতে ক্ষমা ও ভালোবাসা দেখাত, তাহলে সমাজে হিংসা থাকত না। কবিতাটি একটি সামাজিক আদর্শের কথা বলে।
৩. পল্লীজীবনের ভাষা ও চিত্র
'ঘর ভাঙা', 'কূল ভাঙা', 'দিঘল রজনী', 'বিবাগী', 'মালঞ্চ' — এই শব্দগুলো বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন থেকে নেওয়া। জসীম উদ্দীন সাধারণ গ্রামীণ মানুষের ভাষায় গভীর দার্শনিক কথা বলতে পারতেন — এটিই তাঁর বিশেষত্ব।
৪. একতরফা প্রেমের আকুলতা
কবি একা কাঁদেন, একা জাগেন, একা পথে ঘোরেন — যার জন্য এত কষ্ট, সে হয়তো জানেও না বা পরোয়া করে না। এই একতরফা, নিঃস্বার্থ প্রেমই কবিতাকে করুণ ও সুন্দর করে তুলেছে।
৫. ধর্মীয় ও দার্শনিক বার্তা
'শত্রুকে ভালোবাসো' — এই বার্তা সব বড় ধর্মেই আছে। ইসলামে ক্ষমার মহিমা, খ্রিস্টধর্মে 'তোমার শত্রুকে ভালোবাসো', হিন্দু দর্শনে 'অহিংসা পরম ধর্ম' — সব মিলিয়ে এই কবিতা সার্বজনীন মানবিক আদর্শের প্রকাশ।
৬. আশাবাদী মানবতাবাদ
কবি হতাশ নন — তিনি বিশ্বাস করেন ভালোবাসা দিয়েই মানুষকে জেতা সম্ভব। 'আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই' — এই আকুলতায় হার মানার ভাষা নেই, আছে অদম্য আশাবাদ।
বিভাগ ৮ — কাব্যশিল্প ও অলংকার
কাব্যকৌশল | উদাহরণ ও ব্যাখ্যা |
ছন্দ | মাত্রাবৃত্ত ছন্দ — প্রতিটি লাইনে সুনির্দিষ্ট মাত্রা আছে, লোকসংগীতের মতো সুরেলা। |
অনুপ্রাস | 'বিবাগী-পথে', 'কাঁদিয়া বেড়াই', 'বুকভরা বাণ' — একই ধ্বনির পুনরাবৃত্তি। |
রূপক | 'বিষে-ভরা বাণ' = কষ্টকর কথা। 'বুকে কবর বাঁধা' = হৃদয় মেরে ফেলা। 'ফুল মালঞ্চ' = ভালোবাসার পরিবেশ। |
বিরোধাভাস / বৈপরীত্য | ঘর ভাঙা ↔ ঘর বাঁধা, কাঁটা ↔ ফুল, বিষ ↔ গান, কবর ↔ ফুলবাগান — পুরো কবিতা বৈপরীত্যে গড়া। |
রিফ্রেইন (ধুয়া) | "আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর" — দুটি স্তবকের শেষে একই লাইন। জোর ও আবেগ বাড়ায়। |
চিত্রকল্প | 'দিঘল রজনী তার তরে জাগি' — রাতজাগার দৃষ্টিগ্রাহ্য চিত্র। 'রঙিন ফুলের সোহাগ-জড়ানো মালঞ্চ' — বর্ণময় বাগানের চিত্র। |
প্রতীক | কাঁটা = কষ্ট ও আঘাত। ফুল = ভালোবাসা ও সৌন্দর্য। ঘর = জীবনের আশ্রয় ও সুখ। কবর = আশা-নিধন। |
আবেগপ্রবণতা | কবিতা জুড়ে কান্না, জাগা, কাঁদিয়া বেড়ানো — তীব্র আবেগের প্রকাশ যা পাঠককে স্পর্শ করে। |
পল্লীভাষার ব্যবহার | 'বিবাগী', 'দিঘল', 'কহে', 'তরে', 'লাগি', 'ঠাঁই', 'নিঠুরিয়া' — বিশুদ্ধ পল্লীবাংলার শব্দ। |
সমান্তরাল গঠন | প্রতিটি স্তবক একই কাঠামোয় — কষ্টের বর্ণনা, তারপর ভালোবাসার প্রতিদান। গঠনে সামঞ্জস্য। |
বিভাগ ৯ — HSC পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর নির্দেশনা
নিচের প্রশ্নগুলো HSC পরীক্ষায় বারবার এসেছে। প্রতিটির পাশে উত্তর কাঠামো দেওয়া হলো। |
জ্ঞানমূলক প্রশ্ন (১ নম্বর)
প্রশ্ন | উত্তর |
জসীম উদ্দীনের উপাধি কী? | পল্লীকবি। |
'প্রতিদান' কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া? | 'মাটির কান্না' (১৯৫১)। |
'বিবাগী' শব্দের অর্থ কী? | গৃহহীন উদ্বাস্তু পথিক, বিরাগী। |
'দিঘল রজনী' মানে কী? | দীর্ঘ রাত্রি। |
'মালঞ্চ' শব্দের অর্থ কী? | ফুলের বাগান। |
'নিঠুরিয়া বাণী' মানে কী? | নিষ্ঠুর কথা, কঠোর ভাষা। |
অনুধাবনমূলক প্রশ্ন (২ নম্বর)
◆ প্রশ্ন: "কাঁটা পেয়ে তারে ফুল করি দান সারাটি জনম-ভর" — লাইনটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: 'কাঁটা' হলো আঘাত, কষ্ট ও তিক্ততার প্রতীক। 'ফুল' হলো সৌন্দর্য, ভালোবাসা ও কোমলতার প্রতীক। কবি বলছেন — যে কাঁটা (কষ্ট) দিয়েছে, তাকেই ফুল (ভালোবাসা) উপহার দেন। শুধু একবার নয়, 'সারাটি জনম-ভর' অর্থাৎ সারাজীবন ধরে। এটি নিঃস্বার্থ ও নিরন্তর মানবপ্রেমের সর্বোচ্চ প্রকাশ। |
◆ প্রশ্ন: "মোর বুকে যেবা কবর বেঁধেছে" — এই লাইনে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: 'কবর বেঁধেছে' = হৃদয়ে সমাধি বানিয়েছে অর্থাৎ হৃদয়কে মেরে দিয়েছে, সমস্ত আশা-আনন্দ শেষ করে দিয়েছে। যে মানুষটি কবির হৃদয় ধ্বংস করেছে, কবি তার বুক ভরে দেন রঙিন ফুলের মালঞ্চ দিয়ে — অর্থাৎ মৃত্যুর বদলে জীবন দেন। |
◆ প্রশ্ন: কবিতায় 'প্রতিদান' শব্দের বিশেষ অর্থ কী?
উত্তর: সাধারণত 'প্রতিদান' মানে বিনিময়ে একই জিনিস ফেরত দেওয়া — আঘাতের বিনিময়ে আঘাত। কিন্তু এই কবিতায় কবি সম্পূর্ণ বিপরীত প্রতিদান দেন — আঘাতের বিনিময়ে ভালোবাসা, বিষের বিনিময়ে গান, কাঁটার বিনিময়ে ফুল। এই উল্টো প্রতিদানই কবিতার মূল দার্শনিক বার্তা। |
◆ প্রশ্ন: কবিতায় পুনরাবৃত্ত লাইনটির তাৎপর্য কী?
উত্তর: "আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর" — এই রিফ্রেইনটি দুটি স্তবকে পুনরাবৃত্তি হয়েছে। এই পুনরাবৃত্তি কবির অদম্য আকুলতা ও হাল না ছাড়ার মনোভাবকে জোরালো করে তোলে। যত বার পড়ি, ততবার কবির বেদনা ও প্রেমের গভীরতা অনুভব হয়। |
প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতার প্রশ্ন
◆ প্রশ্ন ১: 'প্রতিদান' কবিতায় কবির মানবিক মহত্ত্ব বিশ্লেষণ করো।
কাঠামো: (১) ঘর ভাঙার বিনিময়ে ঘর বেঁধে দেওয়া — উদারতা। (২) বিষের বিনিময়ে গান — ক্ষমাশীলতা। (৩) কাঁটার বিনিময়ে ফুল — নিঃস্বার্থতা। (৪) কবরের বিনিময়ে মালঞ্চ — জীবনদানের আদর্শ। (৫) নিঠুর বাণীর বিনিময়ে মমতা — সর্বোচ্চ মানবিক মহত্ত্ব।
◆ প্রশ্ন ২: কবিতায় ব্যবহৃত বৈপরীত্যগুলো আলোচনা করো।
কাঠামো: ঘর ভাঙা ↔ ঘর বাঁধা, কূল ভাঙা ↔ কূল বাঁধা, বিষ ↔ গান, কাঁটা ↔ ফুল, কবর ↔ মালঞ্চ, নিঠুর বাণী ↔ মমতার স্পর্শ। প্রতিটি বৈপরীত্য কবির মহত্ত্বকে আরও উজ্জ্বল করে।
◆ প্রশ্ন ৩: জসীম উদ্দীনকে 'পল্লীকবি' বলা হয় কেন? এই কবিতার আলোকে আলোচনা করো।
কাঠামো: (১) গ্রামীণ ভাষা ব্যবহার — বিবাগী, দিঘল, নিঠুরিয়া, মালঞ্চ। (২) গ্রামের চিত্র — ঘর ভাঙা, কূল ভাঙা। (৩) নদীভাঙনের রূপক। (৪) লোকসংগীতের ছন্দ। (৫) গ্রামীণ মানুষের সহজ আবেগের প্রকাশ।
বিভাগ ১০ — বহুনির্বাচনী প্রশ্ন অনুশীলন
১. 'প্রতিদান' কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া?
(ক) নকশীকাঁথার মাঠ (খ) রাখালী (গ) মাটির কান্না (ঘ) বালুচর
২. জসীম উদ্দীনের উপাধি কোনটি?
(ক) বিদ্রোহী কবি (খ) পল্লীকবি (গ) নির্জনতম কবি (ঘ) রূপসী বাংলার কবি
৩. 'বিবাগী' শব্দের অর্থ কী?
(ক) বিদেশি (খ) পথিক (গ) গৃহহীন উদ্বাস্তু (ঘ) বিপজ্জনক
৪. কবিতায় 'বিষে-ভরা বাণ'-এর বিপরীতে কবি কী দেন?
(ক) কাঁটা (খ) বুকভরা গান (গ) ফুল (ঘ) কবর
৫. 'দিঘল রজনী' মানে কী?
(ক) ছোট রাত (খ) দীর্ঘ রাত (গ) অন্ধকার রাত (ঘ) একা রাত
৬. কবিতায় 'মোর বুকে কবর বেঁধেছে' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
(ক) মৃত্যু এসেছে (খ) হৃদয় ধ্বংস করে দিয়েছে (গ) কবর খুঁড়েছে (ঘ) ঘর নষ্ট করেছে
৭. কবিতায় কতবার রিফ্রেইন (ধুয়া) ব্যবহৃত হয়েছে?
(ক) একবার (খ) দুইবার (গ) তিনবার (ঘ) চারবার
৮. জসীম উদ্দীন কোন জেলায় জন্মগ্রহণ করেন?
(ক) বরিশাল (খ) ঢাকা (গ) ফরিদপুর (ঘ) রাজশাহী
উত্তর: ১-গ, ২-খ, ৩-গ, ৪-খ, ৫-খ, ৬-খ, ৭-খ, ৮-গ |
© Learnfinity BD | এই লেকচার শিটটি Learnfinity BD-র সম্পদ।
অননুমোদিত অনুলিপি, ফটোকপি বা বিতরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ | Knowledge Without Boundaries